কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি
গাইবান্ধার সদর উপজেলার পলাশপাড়া গ্রামের মো. মকবুল হোসেন ও শেফালী সরকার দম্পতির প্রথম সন্তান মো. ফিরোজ আলম লিংকন। পেশায় তিনি একজন এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসায়ী। মূলত চায়নার সঙ্গে তিনি এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা করেন। চায়নায় যাওয়া আসার সুবাদে পরিচয় হয় ওই দেশের নাগরিক স্কুল শিক্ষক ওয়াং লু ফিং সুফির সঙ্গে। পরিচয়ের সুবাদে তাদের মধ্যে প্রণয় ও পরিণয় হয়। এরপর সুফি ফিরোজের সঙ্গে বাংলাদেশে চলে আসেন।
কিন্তু কর্মচঞ্চল সুফি বেকার বসে থাকতে রাজি নন। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউপির নগরভেলা গ্রামে কিছু জমি ভাড়া নিয়ে সেখানে এস.এস রেয়ার ব্রিজ এন্ড এগ্রো ফার্ম নামে শখের বশে চায়না বিভিন্ন জাতের মুরগী লালন-পালন শুরু করেন তারা। চায়না থেকে ডিম এনে তা ইনকিউবেটরের মাধ্যমে প্রাথমিক অবস্থায় ৮৪টি মুরগী পান। সেখান থেকে এখন তাদের খামারে রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন সহস্রাধিক বিভিন্ন চায়না জাতের মুরগী।
নগরভেলার মুরগীর খামার ছাড়াও রাজধানীর উত্তরা এলাকার উত্তরখানে আরো ৩টি খামার গড়ে তুলেছেন। ওই খামারগুলোর একটিতে ডিম পাড়ানো হয়, একটিতে ইনকিউবেটরের মাধ্যমে ডিম ফুটানো হয় এবং অন্যটিতে বাংলাদেশে দেশী এবং চায়না দেশী মুরগীর মধ্যে ক্রস করানোর প্রক্রিয়া করানো হয়। যাতে করে দুই দেশীর মধ্যে নতুন একটি জাত উদ্ভাবন করা যায়। এতে করে বাংলাদেশের দেশী মুরগীর স্বাদটা ঠিক রেখে চায়না দেশী মুরগীর গ্রোধ রাখা যায়। তাতে কম সময়ে বেশী লাভবান হওয়া যায়।
এস.এস রেয়ার ব্রিজ অ্যান্ড এগ্রো ফার্ম রয়েছে চায়না মুরগীর জাত চায়নিজ দেশী, শিল্কী, কাদানাদ, হুং ইয়াং চি, হো ইয়াংচি, চ কো ছাড়াও চায়নিজ জাতের বিভিন্ন মুরগী। এই দম্পতি চায়না থেকে মুরগী এনে বাংলাদেশের দেশী মুরগী একসঙ্গে লালন-পালন করছে।
মো. ফিরোজ আলম লিংকন জানান, তিনি চায়নায় এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা করেন। চায়না থেকে এ দেশে মাল এনে বিভিন্ন জায়গায় হোলসেলে বিক্রি করেন। তবে করোনা মহামারীর কারণে পুরো বিশ্ব যখন স্থবির হয়ে পড়ে। তখন সমস্ত দেশের ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার কারণে তাদের এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা স্থির গতিতে চলতে থাকে।
এ সময় তার স্ত্রী ওয়াং লু ফিং সুফি শখ করে কিছু মুরগীর ডিম চায়না থেকে এদেশে নিয়ে আসে এবং সেগুলো ইনকিউবেটরের মাধ্যমে ফুটানো হয়। পরে সেই চায়না মুরগীর বাচ্চাগুলো লালন-পালান করতে থাকে। তবে জীবন্ত মুরগী আনতে গেলে অনেক নিয়ম-কানুন মানতে হয়। তাই বিমানবন্দরে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের মাধ্যমে ডিমই আনা হয়। পরে তা প্রক্রিয়াজাত করে ইনকিউবেটরের মাধ্যমে বাচ্চা ফুটানো হয়।
তবে চায়না থেকে যে জাতটা নিয়ে আসা হয়েছে, সেটার গ্রোধ বাংলাদেশের দেশী মুরগীর চেয়ে খুব ভালো এবং মৃত্যুর হার অনেক কম। তবে খরচও কম। কারণ ঘাস, পাতা ও ফেলা দেওয়া খাবার খাইয়ে লালন-পালনের মাধ্যমে এগুলোকে বড় করা যায়। রোগ বালাই কম হওয়াতে এর ওষুধের খরচও কম। সেই মুরগীর বাচ্চাগুলো শখের বশে লালন-পালন করতে করতে মুরগীর সংখ্যা যখন বাড়তে থাকে তখন তারা চিন্তা করেন বাণিজ্যিকভাবে কিছু যায় কিনা। শখ করে ৮৪টি চাইনিজ মুরগী ডিম ইনকিউবেটরের মাধ্যমে বাচ্চা ফুটানোর পর এখানে এখন সাড়ে তিন সহস্রাধিক মুরগী।
তবে হো ইয়াংচি মুরগীর গ্রোধ খুব ভালো অনেকটা পাকিস্তানী মুরগীর মতো। হো ইয়াংচি নিয়মিত ডিম দিচ্ছে। সেই ডিম তাদের নিজস্ব ইনকিউবেটরে ফুটিয়ে বাচ্চা তৈরি করছে। যেখানে তারা বেশ ভাল সুফল পাচ্ছেন। মৃত্যুর হারের দিত থেকে হো ইয়াংচি বাংলাদেশের দেশী মুরগীর চেয়ে এক শতাংশেরও কম। তাই এটাকে আরো উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে যারা মুরগী পালন করতে আগ্রহী, যারা কৃষিকে ভালবাসে বা কৃষি নির্ভর ব্যবসা করতে চায় সেই বেকার যুব সমাজকে কাজে লাগাতে চান তিনি।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের দেশী মুরগী ৪ মাসে ৮০০-৯০০ গ্রাম হয়ে থাকে আর চায়না দেশী মুরগীর ২ মাসে মধ্যে আড়াই কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের যে পিউর দেশী মুরগী জাত, যেটা বাংলাদেশে বেশি দামে বিক্রি হয় সেটা চায়না দেশী মুরগীর সাথে ক্রস করে দুটোর যদি একটি জাত বের করা যায় তাহলে সেটার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাটা বাংলাদেশে মুরগীর চেয়ে ভাল হবে। অনেক সময় দেখা যায় অনেকে বাংলাদেশী মুরগী চাষ বা লালন-পালন করতে গিয়ে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। সেক্ষেত্রে দুটোর ক্রস যে জাত সৃষ্টি হবে তা পালনে অনেকেই আগ্রহী হবে। কারণ এটা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকতে পারে।
ফিরোজ আলম বলেন, মুরগী পালনে ঠাণ্ডাজনিত সমস্যাটা একটু বেশি। তবে চায়না দেশী মুরগী রোগ-প্রতিরোধের ব্যাপারে বাংলাদেশি মুরগীর চেয়ে অনেক কম। সাধারণত চায়না দেশী মুরগীর ঠাণ্ডা জনিত রোগের কারণে মানুষের জন্য যে নাপা বড়ি বা নাপা সিরাপ অথবা এনামাইসিন বেট দিয়ে দু-তিনদিনের একটি কোর্স করালেই মুরগী স্বাভাবিক হয়ে যায়।
তবে চাইনিজ দেশী মুরগীগুলো গরমের সময় ৪০/৪২ সেন্টিগ্রেড ডিগ্রী তাপমাত্রা এবং শীতের সময় ১০ এর নিচে ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারে। এ জন্য এটার মৃত্যুর হার এতো কম। শীতের সময় মুরগী খামারিদের ব্লোডিং এর একটা সমস্যা হয়ে থাকে। দেশী মুরগী, সোনালী মুরগী ও লেয়ার মুরগী ৫ মাস থেকে ডিম দেওয়া শুরু করলেও চায়না জাতের ১/২টি মুরগী বাংলাদেশে পরিবেশের কারণে একটু সময় বেশি লাগলেও বেশির ভাগ চায়না মুরগী ৪ মাস বয়স থেকে ডিম দেওয়া শুরু করে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে শুরু থেকেই ভাল চায়নিজ মুরগী এদেশে লালন-পালন সহজ ছিল না। আস্তে আস্তে এই দেশের পরিবেশের সাথে মিল রেখে রোগ প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে লালন-পালনের উপযোগী করা হয়েছে। মুরগীর ঠাণ্ডা বাড়ছে কেন? গরম লাগছে কেন? এ বিষয়গুলো একটু সময় নিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে কিছু কিছু ওষুধ চায়না থেকে আনা হয়েছে। যেগুলো বাংলাদেশে পাওয়া যায় না।
তবে চায়না থেকে ওই ওষুধগুলো স্বল্পমূল্যে আনা সম্ভব। যারা খামারি আছেন চায়না মুরগীর চাষ করেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও ওষুধ চায়না থেকে নিয়ে আসা হয়। কেউ কেউ শখের বসে পালনের জন্য বা খাওয়া জন্য কিছু কিছু কিনে নিচ্ছে। তবে এটা নিয়ে বাণিজ্য করার ইচ্ছা নেই। দেশের বেকার যুবকদের কর্মমুখী কার জন্যই এই শখের খামার। চাইলে যে কেউ খামারে যোগাযোগ করে ওই জাতের মুরগী কিনে লালন-পালন করে কৃষি মুখি হয়ে নিজের বেকারত্ব দূর করতে পারে। মিটাতে পারে আর্থিক দৈন্যদশা।
ফিরোজ আলমের স্ত্রী ওয়াং লু ফিং সুফি জানান, তিনি আগে একজন শিক্ষক ছিলেন। আর যেহেতু তিনি বাংলাদেশে চলেছেন তাই চেষ্টা করছেন কৃষি বিষয়ের উপর নিজেকে আত্মনির্ভর করা যায় কিনা। তবে তার এ ইচ্ছাটা নিতান্তই শখ থেকেই তৈরি হয়েছে। যেহেতু তিনি এ লাইনে একেবারেই নতুন তাই কোন মুরগী অসুস্থ হয়ে গেলে বা কোন মুরগী মারা গেলে সেই মুরগী তিনি নিজেই ময়নাতদন্ত করেন। পরে সেই বিষয়গুলো নিয়ে অনলাইনে সার্চ দেন।
চায়নায় যে ওষুধটা দিলে এটা ভাল হয়, সেই ওষুধ সম্পৃক্ত কোনো গ্রুপ বাংলাদেশে আছে তা দিয়েই তিনি ব্যবস্থা নেন। মোটামুটি সেই ওষুধ খাওয়ালেই মুরগী ভাল হয়ে যায়। যেহেতু এটা চাইনিজ মুরগী চায়নার পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত। তাই চায়নার সঙ্গে মিল রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হয়। চেষ্টা করা হচ্ছে বাংলাদেশের পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত করতে।
ওয়াং লু ফিং সুফি আরো বলেন, বাংলাদেশের যে দেশী মুরগীটা আছে সেটা খেতে খুবই সুস্বাদু। যদিও বাংলাদেশি মুরগী প্রাকৃতিক খাবার খেয়ে বড় হয়। তবে এটার বড় সমস্যা বাংলাদেশী মুরগীর কম। তবে চাইনিজ যে মুরগীটা আছে, সেটার সঙ্গে যদি বাংলাদেশী মুরগীর ক্রস করানো যায়। তবে দেশী মুরগীর স্বাদটাও ঠিক থাকলো পাশাপাশি গ্রোথও বাড়ল। সেক্ষেত্রে কম সময়ে লালন-পালন করে মুরগী খামারিরা লাভবান হবে বলে তিনি মনে করেন।
চাইনিজ দম্পতির এ চায়না বিভিন্ন জাতের মুরগীর খামারের ব্যাপারে কালীগঞ্জ উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মো. কামরুজ্জামান জানান, তিনি এর মধ্যে খামারটি পরিদর্শন করেছেন। এখানে চায়না শিল্কী জাতের যে মুরগীটা আছে সেটা খুবই সম্ভাবনাময়। খুব কম সময়ের মধ্যে ডিম দেয় এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে বড় ও ওজন বৃদ্ধি হয়। যেহেতু একেবারেই চায়না ওই জাতের মুরগী চালন এদেশে নতুন তাই রোগ-বালাইয়ের ব্যাপারে স্থানীয় প্রাণীসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
Leave a Reply